‍‍`শিল্পীর কোনো অবসর হয় না, বিদায় হয় না‍‍`


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬, ১১:৫২ এএম
‍‍`শিল্পীর কোনো অবসর হয় না, বিদায় হয় না‍‍`

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের স্বর্ণালি দিনের কথা উঠলেই যার নাম সবার আগে স্মরণে আসে, তিনি অভিনেত্রী ববিতা। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিএফডিসির আঙিনায় পা রেখে শুরু হয়েছিল তার পথচলা। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রবর্তনের পর টানা তিনবার সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতে হ্যাটট্রিক, সত্যজিৎ রায়ের 'অশনিসংকেত'-এ অনঙ্গ বউ চরিত্রে আন্তর্জাতিক খ্যাতি—সব মিলিয়ে এক অনন্য যাত্রা। এ বছর তার ঝুড়িতে উঠেছে একুশে পদক। কিন্তু যে চলচ্চিত্রের সঙ্গে সারাটা জীবন কেটেছে, সেই চলচ্চিত্র নিয়েই তার রয়েছে গভীর মনঃকষ্ট।

মানুষের ভালোবাসাই সেরা পুরস্কার
জীবনে অনেক পুরস্কার, অনেক স্বীকৃতি এসেছে—কিন্তু কোনটি আজীবন সেরা মনে হয়? এমন প্রশ্নে ববিতা বলেন, "মানুষের ভালোবাসা। একজন শিল্পীর জীবনে এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।" একটি ছোট ফুলবিক্রেতা মেয়ে একদিন গাড়ির পাশে এসে বলে উঠেছিল, "আপা, আপনার কত সিনেমা দেখেছি"—আর বিনামূল্যে একটি ফুল এগিয়ে দিয়েছিল। ওই মুহূর্তটির কথা তিনি আজও ভোলেননি। কানাডার ক্যালগারিতে গিয়েও প্রবাসী বাঙালি নারীদের পায়ে হাত দিয়ে সালামের উষ্ণতা তাকে অভিভূত করেছিল।

একুশে পদক: সব পুরস্কারের ঊর্ধ্বে
এ বছর চলচ্চিত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ববিতাকে একুশে পদক দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে তিনি বলেন, "দেশি-বিদেশি প্রচুর পুরস্কার পেয়েছি। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে একুশে পদক। এই পদক পেয়ে আমি যে কী খুশি, তা বলে বোঝাতে পারব না।" এই সম্মান তিনি উৎসর্গ করেছেন প্রয়াত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানকে—যিনি তাকে চলচ্চিত্র জগতে এনেছিলেন। পুরস্কারটি আরও আগে পাওয়া উচিত ছিল বলে মনে হলেও তিনি বলেন, "এত দিন পাইনি, এখন পেলাম।"

এফডিসি: আগের মতো নেই
প্রায় ৩০০টি সিনেমায় কাজ করতে গিয়ে যে এফডিসিতে সকাল-বিকাল-রাত তিন শিফটে কাজ করেছেন, সেই প্রাঙ্গণ এখন তার কাছে বেদনার। ববিতা জানান, "গাড়ি যদি এফডিসির পাশ দিয়ে যায়, একবার তাকাই—কিন্তু আর ভালো লাগে না। মনটা কাঁদে।" ফ্লোরগুলো আগের মতো নেই, কোনো কোনোটা ভেঙে ফেলা হয়েছে; সিনেমার শুটিংয়ের বদলে এখন বেশি হয় বিজ্ঞাপন চিত্রের কাজ। একজন জহির রায়হান, খান আতা, আমজাদ হোসেন, সুভাষ দত্ত বা নারায়ণ ঘোষ মিতার মতো পরিচালক আর নেই—এই শূন্যতা তাকে সবচেয়ে কষ্ট দেয়।

প্রশাসন ও অভিজ্ঞদের দূরত্ব
এফডিসির উন্নয়নে কিংবদন্তি শিল্পীদের পরামর্শ নেওয়া হয় কি না—এই প্রশ্নে ববিতার সরাসরি জবাব: "না, এখন ডাকে না।" তার মতে, এফডিসির এমডিকে চলচ্চিত্র সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হবে; শুধু উচ্চপদস্থ আমলা হলেই চলে না। উন্নয়নের কথা অনেক দিন ধরে শুনে আসছেন, কিন্তু বাস্তবে কিছু হচ্ছে না বলে মনে করেন তিনি।

নতুন সিনেমা ও অভিনয়ের প্রশ্ন
ববিতা জানান, ইদানীংকালের সিনেমা তিনি আর দেখেন না। তার আক্ষেপ, আগের যুগে মা-বোনেরা হলে যেতেন, একটি সিনেমা মাসের পর মাস হল থেকে নামত না—সেই দিন এখন নেই। অনেক দেশে বয়স্ক ও অভিজ্ঞ অভিনেতাদের ঘিরে গল্প লেখা হয়—ভারতে যেমন অমিতাভ বচ্চন বা রেখাকে কেন্দ্রে রেখে ছবি তৈরি হয়। আমাদের দেশে তা হয় না বলে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন। এমন কেউ এলে যেন গল্পে চ্যালেঞ্জিং ভূমিকা থাকে—নইলে তিনি করবেন না। কারণ তার সাফ কথা—

"শিল্পীর কোনো অবসর হয় না, বিদায় হয় না।"

প্রযোজক হিসেবে তিক্ত অভিজ্ঞতা
'ববিতা মুভিজ' ব্যানারে তিনি নিজেও ছয়-সাতটি সিনেমা প্রযোজনা করেছিলেন। কিন্তু আখতারুজ্জামানের পরিচালনায় 'পোকামাকড়ের ঘরবসতি' ছবিটি মুক্তির পর ব্যাপক লোকসান হয়, এবং এরপর ববিতা মুভিজ বন্ধ করে দিতে হয়। তিনি বলেন, ভালো সিনেমা বানালেই দর্শক হলে যাবেন না—বাজার চায় নাচ, গান, হইহুল্লোড় আর ফাইট।

আগের গান ও পোশাকের মানের তুলনা
আগের যুগেও বাণিজ্যিক ধারার সিনেমা ছিল, তবে গানগুলো ছিল শ্রুতিমধুর এবং পোশাক ছিল মার্জিত। ববিতা বলেন, তারা মডার্ন সিনেমা করেছেন, মডার্ন পোশাক পরেছেন—কিন্তু কোনো অশ্লীলতা ছিল না। এখনকার কিছু সিনেমায় যে ধরনের পোশাক দেখানো হয়, তা নিয়ে তার প্রশ্ন, "মা-বোনদের নিয়ে সিনেমা হলে যাওয়া যায়?"

সুন্দর শিল্পের স্বপ্ন ও উত্তরণের পথ
ববিতা চান একটি সুন্দর, সম্মানজনক চলচ্চিত্র শিল্প। জহির রায়হান বেঁচে থাকলে এই শিল্প অন্য রকম হতো বলে তার বিশ্বাস। তবে হতাশায় ডুবে থাকতে নারাজ তিনি; সমাধানের পথ হিসেবে বলেন, "অভিজ্ঞজনদের সঙ্গে নিয়ে নতুনদের হাল ধরতে হবে, সবাই মিলে একটা সুন্দর ইন্ডাস্ট্রি গড়তে হবে।"

Link copied!